১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি। সন্ধ্যাবেলা। চট্টগ্রাম জেলে বসে সূর্যসেন খুব সচেতনভাবেই ভাবছেন রাত ১২টা ১ মিনিট বাজতে আর মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বাকি। এ সময়টুকুই পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার এবং তার সহকর্মী তারকেশ্বর দস্তিদারের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হবে।
এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ার কোন সুযোগ নেই। রাত ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসির রজ্জু তাকে পড়তেই হবে। ব্রিটিশ সরকারের আইন ও রায়।
সূর্যসেনের অপরাধ 'দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন, লড়াই করেছেন ব্রিটিশ শাসন-শোষণ, অন্যায়-অত্যচারের বিরুদ্ধে' মঙ্গল পান্ডে থেকে শুরু করে সূর্যসেন পর্যন্ত বা তারও পরে যারা ব্রিটিশ সরকারের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, তাদের ফাঁসি অথবা জেলে আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে মারা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলে ফাঁসির ৫ ঘণ্টা আগে লেখা মাস্টারদা সূর্যসেনের শেষ বাণী :
'আমার শেষ বাণী আদর্শ ও একতা। ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এই ত সাধনার সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এই ত সময়। ফেলে আসা দিনগুলোকে স্মরণ করার এই ত সময়।
কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। তোমরা আমরা ভাই-বোনেরা তোমাদের মধুর স্মৃতি বৈচিত্র্যহীন আমার এই জীবনের একঘেঁয়েমিকে ভেঙে দেয়। উৎসাহ দেয় আমাকে। এই সুন্দর পরম মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়ে গেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহূর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো সেই স্বপ্নের পেছনে আমি ছুটেছি। জানি না কোথায় আজ আমাকে থেমে যেতে হচ্ছে। লক্ষ্যে পেঁৗছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত আমার মতো তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরাও তোমাদের অনুগামীদের হাতে এই ভার তুলে দেবে, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধুরা এগিয়ে চল, এগিয়ে চল কখনো পিছিয়ে যেও না। পরাধীনতার অন্ধকার দূরে সরে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। কখনো হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের হবেই। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইস্টার বিদ্রোহের কথা কোনও দিনই ভুলে যেও না। জালালাবাদ, জুলখা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় মনে রেখো। ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো।
আমাদের সংগঠনে যেন বিভেদ না আসে এই আমার একান্ত আবেদন। যারা কারাগারের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে, তাদের সকলকে জানাই আমার আশীর্বাদ। বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে।
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক
বন্দেমাতরম।'
বিপ্লবী সূর্যসেন জন্মেছিলেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ। চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে। তার পূর্ণনাম শ্রীসূর্যকুমার সেন। তার বাবা নাম রাজমণি সেন। মা শশীবালা সেন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান। পাঁচ বছর বয়সের সময় সূর্যসেনের বাবা মারা যায়। এরপর থেকে সূর্যসেন তার বড় কাকা গৌরমণি সেনের কাছে লালিত-পালিত হয়েছেন। পরে জ্যাঠতুতো দাদা চন্দ্রনাথ সেন তার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রাথমিক পাঠ শেষে সূর্য নোয়াপাড়া মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। এখানে তিনি ৪ বছর পড়েছেন। মাইনর স্কুলটি পড়াশোনার জন্য ভালোই ছিল। কিন্তু ওই স্কুলের সরকারি অনুমোদন না থাকায় তার কাকা গৌরমণি সেন সূর্যকে চট্টগ্রাম নন্দনকাননের ন্যাশনাল স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন।
পড়াশোনা আর কি যেন ভাবনা নিয়ে সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকেন সূর্য। খুব সম্ভব ন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক হরিশ দত্তের কথাগুলো তার মনে গেঁথে গেছে যে,'সত্যিকারের একটা মানব সন্তান চাই, মন দিয়ে লেখাপড়া শিখবে, মানুষের মতো মানুষ হওয়া চাই।' এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার বেশ কিছুদিন পর সূর্য ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। এখন গৃহশিক্ষকের কাজ করে যে টাকা পান তা দিয়ে নিজে চলেন এবং মাকেও কিছু পাঠান।
ওই সময় বঙ্গভঙ্গ রোধকল্পে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তার ঢেউ বাংলার প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এই বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের মূল বিষয় সূর্য না বুঝলেও এ আন্দোলন তার মাঝে রেখাপাত করে।
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বড়লাটকে মারার জন্য ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্লচাকী বোমা নিক্ষেপ করে। বোমা নিক্ষেপের পর প্রফুল্লচাকী ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথায় রিভলবারের গুলি ছুড়ে আত্মহত্যা করেন। এর প্রায় তিন মাস দশ দিন পর ১১ আগস্ট ১৯০৮ ব্রিটিশ সরকার ক্ষুদিরামকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনাও তাকে সেই শৈশবে প্রচন্ড ভাবে মর্মাহত করেছিল।
সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসীর পর লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার "The Renown" এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।
মাষ্টারদা সূর্য সেনকে নিয়ে বাংলাদেশে কোন প্রামাণ্যচিত্র হয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। তবে গতবছর অভিষেক বচ্চনের অভিনয়ে Khelein Hum Jee Jaan Sey ছবিতে মাষ্টারদা সূর্য সেন এর সংগ্রামী জীবন ফুটে উঠেছে।





